চ্যানেল নিউজ ডেস্ক : মাধ্যমিক শিক্ষাক্রমে এবার যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসের সবচেয়ে আলোচিত অধ্যায় ‘২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান’। নতুন পাঠ্যবইগুলোতে ঠাঁই পেয়েছে কোটা সংস্কার আন্দোলন দমন করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কর্তৃক হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণ এবং ছাত্রলীগ-যুবলীগের হামলা ও ফ্যাসিস্ট শেখ হাসনিার পতনসহ নানা বিষয়। একই সঙ্গে বইয়ের পাতায় ফিরেছে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ইতিহাস।
ইতিহাস, কবিতা ও গদ্যে তুলে ধরা হয়েছে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাপ্রবাহ। যেখানে শেখ হাসিনার ক্ষমতার উত্থান, তার সরকারের পতন এবং ভারতে পালিয়ে যাওয়ার ইতিহাস অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত করা হচ্ছে ১৯৭১-পরবর্তী রাজনৈতিক ইতিহাসও।
জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) থেকে প্রকাশিত এবং শিক্ষার্থীদের বিতরণ করা বই ঘেঁটে দেখা গেছে, ষষ্ঠ শ্রেণি থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত বিভিন্ন বিষয়ের পাঠ্যবইয়ে কোটা সংস্কার আন্দোলনের সূচনা, আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়ন, শহীদদের আত্মত্যাগ এবং শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঘটনাপ্রবাহ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় (ইতিহাস), বাংলা সাহিত্য ও ইংরেজি— এ তিনটি বইয়ের মধ্যে জুলাই আন্দোলনের রাজনৈতিক, সামাজিক ও মানবিক দিক তুলে ধরা হয়েছে। তবে, প্রতিটি বইয়ে শিক্ষার্থীদের বয়স ও বোধগম্যতা অনুযায়ী কম-বেশি ও ছোট-বড় অধ্যায় বা পরিচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে।
ষষ্ঠ শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের দ্বিতীয় অধ্যায় ‘বাংলাদেশের ইতিহাস’-এর পাঠ–৯ এ ‘বাংলাদেশ সৃষ্টির পটভূমি ও স্বাধীন বাংলাদেশ’ পরিচ্ছেদে মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতা ঘোষণার ছবি ও বিবরণ পুনরায় যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়া বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন এবং পরদিন ২৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে আবারও স্বাধীনতার ঘোষণা দেন তিনি। দীর্ঘ নয় মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৬ ডিসেম্বর একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠিত হয়।
একই বইয়ের পাঠ–১০ এ ‘স্বাধীন বাংলাদেশে গণঅভ্যুত্থান’ শিরোনামে নতুন একটি পরিচ্ছেদ যুক্ত করা হয়েছে। সেখানে ১৯৭৫ সালে বাকশাল প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একদলীয় শাসন, ১৯৭৯ সালে বহুদলীয় গণতন্ত্রে প্রত্যাবর্তন এবং ১৯৮২ সালে এরশাদের ক্ষমতা দখলের পর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনের ধারাবাহিক বিবরণ রয়েছে। এই পরিচ্ছদে ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের পাশাপাশি ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কথা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পাঠে শহীদ নূর হোসেনের ‘গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ লেখা ঐতিহাসিক ছবি এবং জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবু সাঈদের দুই হাত প্রসারিত করা ছবি সংযুক্ত হয়েছে।
এই অংশে উল্লেখ করা হয়েছে, ‘২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর ২০১১ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা বাতিল হলে গণতান্ত্রিক কাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। বিরোধী মতের ওপর দমন-পীড়ন, গুম, খুন, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানসমূহকে অকার্যকর করার মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের জুন মাসে সরকারি চাকরিতে কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলনে নামলে সরকারদলীয় সন্ত্রাসী ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আন্দোলন দমনে সহিংসতা চালায়। ১৬ জুলাই রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে ওয়াসিম আকরামসহ ছয়জন নিহত হন। এসব ঘটনার পর আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে এবং একপর্যায়ে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে একদফা ঘোষণা আসে। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট হাজারো শহীদের রক্তের বিনিময়ে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটে এবং তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। এই আন্দোলনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান’ নামে অভিহিত করা হয়েছে।’
সপ্তম শ্রেণির বাংলা বই ‘সপ্তবর্ণা’-য় কবিতা অংশের ৯ নম্বর কবিতা হিসেবে যুক্ত হয়েছে হাসান রোবায়েতের লেখা ‘সিঁথি’। কবিতাটির পাঠ-পরিচিতিতে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন বাংলাদেশের মানুষের জন্য এক নির্মম ও মর্মন্তুদ অভিজ্ঞতা হলেও এই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে মানুষ নতুন করে মুক্তির স্বাদ পেয়েছে। কবিতায় শিক্ষার্থী-জনতার আত্মত্যাগ, রক্তপাত এবং দেশের কল্যাণ ও মানুষের মুক্তির প্রত্যয় ফুটে উঠেছে।
একই শ্রেণির ‘বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়’ বইয়ের প্রথম অধ্যায় ‘বাংলাদেশের মুক্তি সংগ্রাম ও গণআন্দোলন’-এ ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় মেজর জিয়াউর রহমানের স্বাধীনতার ঘোষণার বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। পরবর্তী পাঠে বাংলাদেশের গণআন্দোলন ও ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিক বিবরণ রয়েছে। সেখানে কোটা সংস্কার আন্দোলনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ঘটনাপ্রবাহ, আন্দোলন দমনে হত্যাকাণ্ড এবং হেলিকপ্টার থেকে গুলিবর্ষণের কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
অষ্টম শ্রেণির বাংলা বইয়ের সাহিত্য কণিকায় ‘গণঅভ্যুত্থানের কথা’ শিরোনামের প্রবন্ধে গণঅভ্যুত্থানের ধারণা ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নিকট-ইতিহাসে তিনটি বড় গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত হয়েছে— ১৯৬৯ সালে আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে, ১৯৯০ সালে এরশাদের বিরুদ্ধে এবং ২০২৪ সালে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে। প্রবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০২৪ সালের আন্দোলনের নেতৃত্ব ছিল শিক্ষার্থীদের হাতে এবং সহস্র মানুষের জীবনের বিনিময়ে এই আন্দোলন সফল হয়।
অষ্টম শ্রেণির বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয় বইয়ের ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ও গণতান্ত্রিক সংগ্রাম’ অধ্যায়ে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের কারণ, পটভূমি ও ফলাফল আলাদা পরিচ্ছেদে তুলে ধরা হয়েছে। এখানে বলা হয়েছে, আন্দোলনের সময় ছাত্রলীগ ও যুবলীগের সশস্ত্র কর্মী এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা হামলা চালায়। একই সঙ্গে রংপুরে পুলিশের গুলিতে আবু সাঈদ এবং চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের হামলায় ওয়াসিম আকরাম নিহত হওয়ার ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
সিএন/ তিতাস
Leave a Reply